প্রসঙ্গ সম্মিলনী

সভাপতির বক্তব্য

মুনতাসীর মামুন

মূলত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বা বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস

স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক করার দাবি নিয়ে ১৯৯৯ সালে আমরা

কয়েকজন পথে নেমেছিলাম | প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন কলেজে এ নিয়ে আমরা

কর্মশালা করি | ২০০১ সালে বিএনপি জামায়াত জোট মুক্তিযুদ্ধের বা জাতীয়

ইতিহাসের পাঠ,পাঠ্যপুস্তক ও দলিলপত্রে বদলে দেয় |এই ধরনের ইতিহাস বিকৃতি

আমাদের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরে |আশ্চর্যের বিষয় ঐ সময় ইতিহাস

সমিতি, ইতিহাস পরিষদ,এমনকি এশিয়াটিক সোসাইটি বা কোন ঐতিহাসিক এই

ইতিহাস বিকৃতির প্রতিবাদ করেননি |এমনকি এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত

বাংলাপিডিয়াতেওস্বাধীনতার ঘোষণা ইত্যাদি বিষয়গুলি এড়িয়ে যাওয়া হয়

যদিও তা ছিল বাংলাদেশ বিষয়ক-জ্ঞানকোষ’ |

এ শতকের শুরুতে আমাদের দেশে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বহুলভাবে শুরু

হয় |জঙ্গিবাদ ও উগ্র মৌলবাদের বিকাশ ঘটে এবং এসবের প্রশ্রয়দাতা ছিল

রাজনৈতিক সরকার । অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিকল্প হিসেবে

সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করে

তৎকালীন সরকার ও কিছু রাজনৈতিক দল| মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জন বিনষ্টের

জন্য ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়| এটি সম্ভব হয় প্রায় ত্রিশদশক

মুক্তিযুদ্ধের চর্চা করতে না দেয়া ও জানতে না দেয়ার কারণে| নতুন প্রজন্মের

অনেকেই ছিল বিভ্রান্ত| এ কারণে আমাদের মনে হয়-

১. দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিজের দেশ সম্পর্কে জানা জরুরি|

২. নিজের দেশ সম্পর্কে জানলে দেশের প্রবাহমান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে সে সচেতন হবে|

৩. দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা থাকলেই তার দেশপ্রেমে গভীরতা আসবে|

৪. মনস্তাত্ত্বিক ভাবে সে নিজেকে শেকড়হীন ভাববে না|

৫.১৯৪৭-১৯৭৫ সালের ইতিহাস সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে জানাতে হবে|

মূলত এইসব ধারণা কার্যকর করার জন্য অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখি ইতিহাস

চর্চার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য একযুগ বিক্ষিপ্ত আন্দোলনের পর আন্দোলন

সংহত করার লক্ষ্যে ২০১২ সালে ‘বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী’ যাত্রা শুরু করে|

বাংলাদেশ্ ইতিহাস সম্মিলনীর সারা বছর ধরেই কোনো না কোনো কর্মসূচি থাকে

। সেমিনার, লোক বক্তৃতা, আলোচনা সভা, একক বক্তৃতা, আন্তর্জাতিক

সেমিনার, প্রদর্শনী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । সম্মিলনীর উদ্যোগে ইতোমধ্যে খুলনায়

বাংলাদেশের প্রথম গনহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়

।ইতিহাস সম্মিলনীর মুখপত্র হিসেবে নিয়মিত “সম্মিলনী বার্তা” প্রকাশিত হচ্ছে ।

সম্মিলনী বার্তার এ পর্যন্ত মোট ১০টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে । গত দু’বছরে

ইতিহাস সম্মিলনীর কার্যক্রমের ধারাবাহিক বিবরন সম্মিলনী বার্তার

সংখ্যাগুলোতে পাওয়া যাবে । তাই বিশদ বিবরণ অনাবশ্যক বিবেচনায় প্রধান

কার্যক্রমগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলো-

২১ জানুয়ারী, ২০১৩ তারিখে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স কক্ষে “মাধ্যমিক ও

উচ্চ মাধ্যমিক কারিকুলাম : প্রসঙ্গ ইতিহাস” শীর্ষক মত বিনিময় সভার

আয়োজন করা হয় । ‍সভায় সভাপতিত্ব করেন সম্মিলনীর সভাপতি অধ্যাপক

মুনতাসীর মামুন । প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ সেলিম । মত

বিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সম্মানীয় প্রধানমন্ত্রীর

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ।

১৭ মে,২০১৩ তারিখে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে

“ইতিহাস ঐতিহ্য ও ধর্ম বাংলাদেশ এখন” শীর্ষক আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ পাঠ

করেন বিশিষ্ঠ লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী জনাব শাহরিয়ার কবীর,

সম্মানিত অতিতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মণ্ত্রণালয় ‍সম্পর্কিত সংসদীয়‍

স্থায়ী কমিটির সভাপতি জনাব রাশেদ খান মেনন । ‍সভায় সভাপতিত্ব করেন

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ।আলোচনায় অংশ নেন জাতীয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাহবুবর রহমান এবং প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও

শোলাকিয়া ঈদের জামাতের খতিব আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ ।

৪ জুন, ২০১৩ তারিখে বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনীর পক্ষ থেকে অধ্যাপক

মুনতাসীর মামুনের নেতৃত্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‍সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি

জনাব রাশেদ খান মেননের নিকট তাঁর জাতীয় সংসদ কার্যালয়ে কক্ষে

“মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকসহ সর্বস্থরে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাস (১৯৪৭-

১৯৯০) অবশ্য পাঠ্য” করার দাবীতে স্মারক লিপি প্রদান করা হয় ।

২১ জুলাই, ২০১৩ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‍সম্পর্কিতস্থায়ী কমিটির ৩৫তম বৈঠকে

ইতিহাস সম্মিলনীর দাবীর বিষয়টি আলোচ্যসূচির অন্তর্ভূক্তকরা হয় । অধ্যাপক

মুনতাসীর মামুনের নেতৃত্বে ইতিহাস সম্মিলনীর একটি প্রতিনিধি দল স্থায়ী

কমিটির বৈঠকে অংশ গ্রহণ করেন।আ্মাদের জানা মতে স্বাধীনতার পর

প্রথমবারের মত সংসদীয় স্হায়ী কমিটির নিয়মিত সভায় ”জাতীয় ইতিহাস

পাঠ্য’’ বাধতামূলক করা এবং ইতিহাস সম্পর্কিত সমস্যা ও সমাধানের উপায়

নিয়ে আলোচনা হয়।সংসদীয় স্হায়ী কমিটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ঘোষনা করে

যে,স্নাতক(পাস ও সম্মান)পর্যাযের সকল ধারার শিক্ষার জন্য “বাংলাদেশের

জাতীয় ইতিহাস”(১৯৪৭-১৯৭৫)অবশ্য পাঠ্য করা হবে এবং সরকারি কলেজে

ইতিহাস বিষয়ের সুপার নিউমারিক অধ্যাপকের পদ সৃষ্টির নির্দেশনা প্রদান করে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য প্রফেসর ড.হারুন-অর-রশিদ ২০১৩-

২০১৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ লক্ষ শিক্ষার্থীর জন্য “স্বাধীন

বাংলাদেশের জাতীয়্ ইতিহাস (১৯৪৭-১৯৭৫)” শীর্ষক পত্র অবশ্য পাঠ্য করার

আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন

৮ আগষ্ট,২০১৩ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয়

্তিহিাস (১৯৪৭-১৯৭৫) কোর্সেও পাঠক্রম প্রণয়নের জন্য প্রফেসর

মুনতাসীর মামুনকে আহ্বায়ক করে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করে।

উল্লেখ্য, সিলেবাস কমিটি স্বল্প সময়ে অত্যন্ত পরিশ্রম করে পাঠক্রম

প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করেন।

‘ধর্ম ও রাজনীতি : দক্ষিণ এশিয়া’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক

গণবক্তৃতা ও সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গত ৪ ও ৫ অক্টোবর, ২০১৩

তারিখে সিরডাপ মিলনায়তনে এটি অনুষ্ঠিত হয়। ভারত, পাকিস্তান,

নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন

দক্ষিণ এশীয় বিশেষজ্ঞগণ এই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রবীণ অধ্যাপক,

গবেষক, সাংবাদিক, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ

মানুষ প্রবল আগ্রহ ভরে দু’দিনের গণবক্তৃতায় উপস্থিত ছিলেন।

মহান ভাষা আন্দোলন স্মরণে ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তারিখে জাতীয়

জাদুঘরের সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে “মাতৃভাষায় ইতিহাস

চর্চা ও গুরুত্ব” শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করা হয়। সেমিনারে

ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক

সু¯œাত দাস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের

অধ্যাপক মেসবাহ কামাল পৃথক পৃথক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

অসাম্প্রদায়িক ইতিহাস চেতনাকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে

সম্মিলনীর আঞ্চলিক কমিটি সমূহ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে সম্মিলনীর খুলনা, রাজশাহী ও

ময়মনসিংহ কমিটি পৃথক ভাবে সেমিনার ও সম্মেলন আয়োজন করে।

৭-৮ ফেব্রুয়ারি খুলনা শহরে দু’দিনব্যাপী ইতিহাসের বই মেলা,

সেমিনার ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। খুলনা শহরে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রথম

শহীদ সুবেদার জয়নাল আবেদিনের কবর চিহ্নিত করে ফলক লাগানো হয়।

শহরের নিকটবর্তী ভৈরব নদীর তীরে দিঘলিয়ার দেয়ারা গ্রামে গণকবর

স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

রাজশাহীতে হেরিটেজ আর্কাইভ ও সম্মিলনীর জেলা কমিটির যৌথ

উদ্যোগে ২২ মার্চ, ২০১৪ তারিখে সেমিনার ও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

ময়মনসিংহ কমিটি ২৯ মার্চ,২০১৪ দিনব্যাপী সেমিনার ও সম্মেলন

আয়োজন করে। বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল

ইসলামের বাসভবন ও তার কর্মস্থল আনন্দমোহন কলেজের ইতিহাস

বিভাগ এবং আনন্দ  মোহন বসুর বাসগৃহে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়।

৩-৪ মে ২০১৪ তারিখে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য

বিশারদ মিলনায়তনে “১৯৭১ : বাংলাদেশ এবং পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত :

স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ ’’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত

হয়। বাংলাদেশের ৪৩তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে ঐতিহাসিক স্মৃতি স্মরণ

করা এবং আনন্দ-বেদনা, গৌরবের সেই দিনগুলোর কথা বর্তমান

প্রজন্মকে জানানোর জন্য এই আয়োজন । আশাতীত সাড়া পেয়েছি

সবার কাছ থেকে। ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যসমূহ এবং

বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা সেমিনারের ৬টি অধিবেশনে অংশগ্রহণ

করেছেন । মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও নানা

খুঁটিনাটি বিষয়, সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা আলোচিত হয়েছে ।

সম্মিলনীর উদ্যোগে গত ১৭ মে, ২০১৪ বাংলাদেশে প্রথমবারের মত

খুলনায় “১৯৭১ : গণহত্যা, নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ’’

প্রতিষ্ঠা করা হয়।মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় গণহত্যা, নির্যাতন

নিয়ে আলোচনা খুব একটা চোখে পড়ে না । ইসলাম ধর্ম রক্ষার নামে

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীরা বাঙালি

জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য পরিকল্পিত ভাবে অত্যাচার নির্যাতন,

গণহত্যা শুরু করে। মাত্র ন’মাসে ৩০ লক্ষের অধিক শহীদ হয়েছেন। প্রায়

৬ লক্ষ নারী ধর্ষিত হয়েছেন। জীবন, সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য ১ কোটি

মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। মূলতঃ অত্যাচার, নির্যাতন ও

গণহত্যার ইতিহাসই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রধান বিষয়। তাই এই

আর্কাইভ ও জাদুঘর গড়ে তুলতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী

প্রতিটি নাগরিকের আন্তরিক সাহায্য সহায়তা প্রার্থনা করছি।

আর্কাইভ উদ্বোধন করেন বরেণ্য ইতিহাসবিদ ও সম্মিলনীর সভাপতি

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত

করেন,‘একদিন মানুষের দানে এই আর্কাইভ ও জাদুঘর এক বিশাল

প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। দেশ-বিদেশের গবেষকরা এখানে গবেষণা

করতে আসবেন। আর এই আর্কাইভ ও জাদুঘর প্রজন্মের পর প্রজন্ম

মনে করিয়ে দেবে,স্বাধীনতা শুধু চার অক্ষরের শব্দ মাত্র নয়।’

আর্কাইভ ও জাদুঘর উদ্বোধন উপলক্ষে ১৭-১৯ মে তিনদিনব্যাপী

গণহত্যা, নির্যাতনের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এ

উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত

ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বিপুল

সংখ্যক দর্শনার্থী আলোকচিত্র দেখতে আসেন।১৭ মে, ২০১৪ তারিখে

খালিশপুর মুন্সিবাড়ি গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে স্মৃতিফলক স্থাপন

করা হয়। স্মৃতিফলক উদ্বোধন করেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।

উল্লেখ্য ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল খুলনার মুন্সিবাড়িতে রাজাকার

বাহিনী ১২ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে।

জাতীয় শোক দিবস ২০১৪ উপলক্ষে বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী একক

বক্তৃতার আয়োজন করেছিল। বঙ্গবন্ধু বিষয়ক বক্তৃতাটি প্রদান

করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক  ড. হারুন-অর-

রশিদ। তাঁর বক্তৃতাটি সম্মিলনী পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেছে।

পুস্তিকাটির নাম- বাঙালির জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম ও জাতির জনক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মূল্য মাত্র ১০ টাকা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য

যে, কোনো পেশাদারী একাডেমিক প্রতিষ্ঠান  ইতিপূর্বে জাতীয়

শোক দিবস পালন করেনি। সংগ্রহে রাখার জন্য আগ্রহীদের

সম্মিলনীর দপ্তর সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ

জানাচ্ছি। এই অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য

রেখেছেন সংসদ সদস্য ড. মহীউদ্দিন খান আলমগীর।

ইতিহাস চর্চা ব্যাপকতর করার জন্য আমরা যে আন্দোলন করছি এবং এ

ক্ষেত্রে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন যে ভ’মিকা রাখছেন তার কিছু

ইতিবাচক ফল পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই প্রথমবারের মতো সরকারি কলেজ

সমূহে ইতিহাস শিক্ষকদেও ১০৬ জন পদোন্নতি পেয়েছে। গত ৪০

বছরে এতো বেশি শিক্ষক একসঙ্গে পদোন্নতি পাননি। প্রাক্তন

প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস

বাধ্যতামূলক করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কর্ম কমিশনে চিঠি

পাঠিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ঘোষণা করেছেন বিসিএস

পরীক্ষায় ১০০ নম্বরের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি কোর্স থাকবে।

আপনারা সবাই আমাদের সংগ্রামে শরিক হলে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে

আমরা আরো ইতিবাচক ফলাফল লাভ করতে পারব।

ইতিহাস সম্মিলণীর কর্মকাণ্ডের অন্যতম লক্ষ্য হলো একটি ইতিহাস

মনস্ক জাতি গঠন করা। এই ক্ষেত্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত

ইতিহাস সচেতন সবার কাছে সমাদৃত হয়েছে। আমরা আনন্দের সঙ্গে

লক্ষ্য করলাম যে,জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১২ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীর

প্রয়োজনের কথা উপলদ্ধি করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ওপর স্বল্প

সময়ে প্রচুর গ্রন্থ রচিত হয়েছে। একটি পত্রের জন্য ইতোপূর্বে এত

ব্যাপক সংখ্যক বই আর লেখা হয়নি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ইতিহাস সম্মিলনী স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের

ইতিহাস বিষয়ে প্রণীত গ্রন্থ সমূহের একটি মূল্যায়নের

প্রয়োজন অনুভব করে। এই লক্ষ্যে “বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চার নতুন

মাত্রা : মুক্তিযুদ্ধের পাঠক্রম” শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করা হয়অ গত

২৪ অক্টোবর,২০১৪ তারিখে অনুষ্ঠিত সেমিনারে যৌথভাবে প্রবন্ধ

উপস্থাপন করেন এস এম তানভীর আহমদ, আফসানা আহমেদ ও আইরীন

আহমেদ। মূল প্রবন্ধ সংক্ষিপ্ত আকারে বার্তা ৯ এ প্রকাশিত হয়।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বওে ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও

জাদুঘর এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর যৌথভাবে গণহত্যা ও

নির্যাতন শীর্ষক ৮ দিন ব্যাপী এক বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করে।

প্রদর্শনী শুরু হয় ৯ ডিসেম্বও, ২০১৪। প্রদর্শনীতে জাতীয় জাদুঘরে

সংরক্ষিত গণহত্যার ৩০টি নিদর্শন, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন

সংগ্রহশালার ৭০টি গ্রন্থ এবং বিশিষ্ট চিত্র শিল্পীদেও চিত্রকর্মের

অনুকৃতি ও গণহত্যার আলোকচিত্র স্থান পায়। প্রদর্শনী উদ্বোধন

করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান নূর এম.পি।

প্রতিদিনই প্রদর্শনীতে নানা বয়সের বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর

আগমন ঘটে। এই বিশেষ প্রদর্শনীর নিদর্শন, গ্রন্থ ও দুর্লভ

আলোকচিত্র সমূহ আগত দর্শকদের ১৯৭১ সালের ভয়াবহ গণহত্যা,

নারকীয় ও বর্বর নারী নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

বিজয়ের মাসে আনন্দ, গৌরবের পাশাপাশি এই প্রদর্শনী বাঙালির

ত্যাগ, কষ্ট, নির্যাতন, অপমানের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মেও

সামনে যথাযথ গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেছে। উল্লেখ্য, জাতীয়

জাদুঘরের একটি সূত্র জানিয়েছে যে সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরের

আর কোনো প্রদর্শনীতে এত ব্যাপক সংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন

ঘটেনি। বিজয় দিবস ২০১৪ উপলক্ষে, ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন

আর্কাইভ ও জাদুঘর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও জাতীয় কবিতা

পরিষদের উদ্যোগে ১৫ ডিসেম্বর,২০১৪ বিশিষ্ট কবিদের গণহত্যা ও

নির্যাতনের কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়। এটি ছিল বাংলাদেশে

প্রথমবারের মতো আয়োজিত ব্যতিক্রমী কবিতা পাঠের আসর।

এছাড়া ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও

জাদুঘরের উদ্যোগে ব্রিটেনের “কমলা কালেক্টিভ” পরিবেশিত

‘বীরাঙ্গনা’ নাটক জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয়।

মিলনায়তনে বিপুল সংখ্যক দর্শকের উপস্থিতিতে পিনপতন

নিস্তবদ্ধতায় পরিবেশিত নাটকটি সবার অন্তর ছুঁয়ে যায়। গণহত্যা-

নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের উদ্যোগে বিজয়ের মাসে ১৯৭১ :

গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালার ২২টি গ্রন্থ প্রকাশিত

হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে এক একটি গণহত্যার ওপর গবেষণামূলক

গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্যোগ এর পূর্বে নেওয়া হয়নি।

অপেক্ষাকৃত একটি নবীন সংগঠন হিসেবে ইতিহাস সম্মিলনী

ইতোমধ্যে যে সমস্ত কর্মকা- সম্পন্ন করেছে, তার গুরুত্ব জাতীয়

গণমাধ্যমসহ সর্ব মহলে স্বীকৃতি লাভ করছে। আমাদেও সীমিত

সামর্থ্যওে মধ্যে ইতিহাসকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাবার

আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। সম্মিলনীর কর্মকা- সুসম্পন্ন

করার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান আর্থিক সহায়তাসহ

নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা

জানাই। আশা করি ইতিহাস সম্মিলনীর প্রতি আপনাদের সাহায্য,

সহানুভূতি অটুট থাকবে।